সভাপতি, ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগ

রাজনীতিবিদ বনাম রাজনীতিজীবি

কৃষক-শ্রমিক, তাঁতি, কামার-কুমার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল-মোক্তার, ব্যাসায়ী,শিক্ষক সরকারী-বেসরকারী কর্মকর্তা কর্মচারী সকল পেশাজীবি মানুষের জীবন জীবিকার জন্য আয়ের উৎস রাষ্ট্রকাঠামোর সংবিধিবদ্ধ একটি স্বীকৃতি। প্রতিটি নাগরীকের ব্যাক্তিগত বা সমষ্টিগত কঠিন শ্রম-ঘাম ও রাষ্ট্রিয় কায্যক্রমেই অর্থনৈতিক সভ্যতার বুনিয়াদ গড়ে উঠেছে। আদিম সাম্যবাদী অনগ্রসর সমাজ থেকেই মানুষ ধীরে-ধীরে শ্রম নির্ভর অর্থনীতিকে রাজনীতিকরনের মাধ্যমে একটি কল্যান সমাজ বিনির্মান করতে সক্ষম হয়েছেন। হাজার বছরের সমাজ বিবর্তনে মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞানকে বংশপরম্পরায় বহন করে অভিজ্ঞতার আলোকে সমাজকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। গোষ্টির সর্দার, রাজা, রানী, জমিদার, বাদশা, নেতা সমাজের কর্নদার হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রকে শাষন করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, রাষ্ট্রিয় সম্পদ ব্যাহার করে ভোগবিলাশ করেছেন।

রাষ্ট্রিয় সম্পদ ব্যাবহার করে আয়েশী জীবন যাপন করার সিষ্টেম এখনো পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়নি। অটোক্রেসি, সুলতানাত,রাজতন্ত্র,গোত্রপ্রধান আদিবাসী সমাজে এখনো তাহা বহাল আছে। একটি গনতান্ত্রীক সমাজে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য জনগনের মতামতকে সর্বোচ্ছ অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাজনীতি একটি মহান নীতি। দেশ প্রেমের ব্রত নিয়ে জীবনের আয়েশী সুখ বিলাশ পরিহার করে একজন মানুষ দেশ ও মানুষের জন্য রাজনীতিবিদ হিসাবে নিজেকে উৎসর্গ করে থাকেন। ধনী দরীদ্র উচ্ছ নিম্ন মধ্যবিত্ত যে কোন পরিবার থেকেই রাজনীতিবিত হতে পারেন। একজন রাজনীতিবিদ বুক ভরা ভালোবাসা নিয়ে মানুষের কল্যানে নিজকে উৎসর্গ করেন। সমাজের অন্যায় অবিচার শোষন বঞ্চনা নিপিড়নের বিরুদ্ধে মজলুম নিপিড়িত মানুষের কল্যানে তাদের পাশে দাঁড়ানোর মহান ব্রত নিয়েই একজন রাজনীতিবিদ কাজ শুরু করেন। মানুষের বিশ্বাস আর ভালোবাসা অর্পিত হলেই একজন মানুষ রাজনৈতিক নেতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ ঘটে।

রাষ্ট্রের নেতৃত্ব রাজনৈতিক নেতা থেকেই তৈরী হবে এমন নয়। যে কোন পেশার মানুষ তার উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে সফলতা অর্জন করলেই রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।ভারতের রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবুল কালাম একজন বৈজ্ঞানিক হয়ে পৃথ্বি নামক ক্ষেপনাস্র তৈরীতে সফল হয়েছেন। রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে নিজকে শুধু ভারতের ইতিহাসে নয় পৃথিবীকে চমকে দিয়ে রাজনীতিবিদ হিসাবে স্থান করে নিয়েছেন। ভোগের মাঝে রাজনৈতিক সৌন্দর্য্য লুকায়িত নয়, ত্যাগের মাঝেই মহত্ব লুকায়িত থাকে। মহাত্মা গান্ধী ব্যাক্তি জীবনে খ্যাতিমান ব্যারিষ্টার ছিলেন। ভারতবাসির মুক্তির সংগ্রামের অহিংস এই মহান জাতীয়তাবাদী নেতা রাজনীতিবিদ হিসাবে জাতিসংঘের অধিবেসনে হাজির হলে সাংবাদিকরা তাকে লেংটি পরার কারন জিজ্ঞাসা করেন, তিনি বলেছিলেন ভারতবর্ষের সবচাইতে গরীব লোকটি লেংটি পরে, আমি তাদের প্রতিনিধিত্ব করি, সেই কারনে তাদের পোষাকই আমার পোষাক। নোবেল কমিটি অনেক পরে বিশ্ববাসির কাছে গান্ধিজীকে নোবেল পুরুস্কার দিতে না পারার জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন।

অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা নিজের অর্থবিত্ত আদর্শের জন্য দেশ ও মানুষের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছেন। কারাগারের রুদ্ধকক্ষে জীবন যৌবন ক্ষয় করেছেন। ব্যাক্তি স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। সততা ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল বিশ্বাসী নেতাকে জনগন নেতা হিসাবে মেনে নিয়েছেন। যিনি ব্যাক্তি জীবনে জনগনের জান মাল ও সম্পদ হেফাজত করতে পারবেন তিনিই জনগনের নেতা। মানুষের মুক্তির সংগ্রামে যিনি অবিচল তিনিই নেতা। অসহায় নিপিড়িত নির্যাতিত মানুষের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সামাজীক মুক্তির জন্য যিনি কাজ করেন তিনিই নেতা। জুলুম অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে যিনি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম তিনিই নেতা। মানুষের অধিকার আদায়ে যিনি অবিচল তিনি গনমানুষের নেতা। ফাঁসির মঞ্চে হাসি মুখে জীবন দিয়ে যিনি ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন তিনিই নেতা।

স্মৃতিবিজড়ীত বাঁধাধরা কতগুলো নিয়ম পালন করার নাম রাজনীতি নয়। দিবস পালন করা হয় ঐ দিবসের যথাযথ তাৎপর্য্য অনুধাবন করে ব্যাক্তিজীবনে প্রতিফলন করার জন্য। দিবসকে আনন্দ বা পূজিত করার জন্য নয়। মিটিং মিছিলে মানুষ সমাগম করে বড় মিছিল কিংবা বড় সমাবেশ প্রদর্শিত করার নাম রাজনীতি নয়। একটি রাজনৈতিক দলের এসব কর্মকান্ড পরিচালনা করা সংগঠনকে ক্রিয়াশীল করে তোলা মাত্র। এসবের আবেদন ও প্রয়োজনীয়তা সময় এবং ক্ষমতা মোতাবেক তারতম্য ঘটে। একজন প্রতাপশালী সমাজবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিধর মানুষের আহবানে অধীক জনসমাবেশ হতে পারে এই সকল জড়ো হওয়া সমাবেশের নামও রাজনীতি নয়। মিলিটেন্ট রাজনৈতিক শক্তির সমাবেশে কর্মী বেষ্টিত জড়ো সভাসমিতির নামও রাজনীতি নয়।

রাজনীতির পদ পদবী ক্রয় করে পদ ধারন করার নাম রাজনীতিবিদ নয়। জনগন কতৃক ভালোবাসার ম্যান্ডেট অর্জন করে জনগনের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা অর্জনের করেই রাজনীতিবিদ হতে হয়। প্রকৃত রাজনীতিবিদ কখনো নেতা হওয়ার বাসনা লালন করতে পারে না। সেবা ভালোবাসা আর অপূর্ব আত্মত্যাগের বিনিময়ে নিজের অজান্তেই জনগন জোর করে নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে দেন। নেতা হওয়ার পাশবিকতা একজন নেতাকে রাজনীতিবিদ থেকে রাজনীতিজীবিতে পরিনত করে তোলে। রাষ্ট্রীয় রাজনীতির ক্ষমতা ব্যাবহার করে মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অর্থবিত্তের মালিকানা অর্জন করার নাম রাজনীতি নয়। জ্ঞাত আয় বহিরভূত অর্থের প্রদর্শন করে নিজকে রাজনীতিবিদ প্রমানের কোন সুযোগ নেই।উপার্জিত অর্থবিত্তকে নিরাপত্তার বেষ্টনীতে রাখার জন্য রাজনীতির ময়দানে শ্রম ও উপার্জিত অনৈতিক অর্থ ব্যায় করে কতেক অনুগত বাহিনী সৃষ্ট্রির নাম রাজনীতি নয়।

একজন রাজনীতিবিদ দেশপ্রেম ও মানুষকে ভালোবাসার মন্ত্রে দিক্ষিত হয়েই ব্যাক্তি জীবনের সুখ বিসর্যন দিয়ে জেল জুলুম অত্যাচার নির্যাতন ভোগ করে মানব কল্যানে নিজকে সমর্পন করেন। একজন রাজনীতিবিদ রাজনীতি করেন নির্যাতিত মানুষের জাতীয়তার জন্য। স্বদেশ হারানো মানুষের স্বদেশের জন্য।হতদরীদ্র মানুষের মুক্তির জন্য। শোষনের অত্যাচারের বিরুদ্ধে শোষন মুক্ত সমাজের জন্য। ক্ষুদার্ত মানুষের ক্ষুদা নিবারনের জন্য। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়ে সন্ত্রাস মুক্ত সমাজ বিনির্মানের জন্য। দুর্নিতির বিরুদ্বে দূর্নিতিমুক্ত সমাজের জন্য প্রকৃত রাজরীতিবিদরা রাজনীতি শুরু করেন। একটি নিদৃষ্ট লালিত আদর্শ বাস্তবায়নের জন্যই রাজনীতিবিদরা রাজনীতি করেন। মানুষের উন্নত জীবন উপহার দেওয়াই রাজনীতির মূল দর্শন।

রাজনীতির একটি সংঘবদ্ধ জনগোষ্টিকে কাজে লাগিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধির নাম রাজনীতি নয়। আদর্শিক উদ্দেশ্য ব্যাতিত জনগনকে তোয়াক্কা না করে সমাজ বিরোধী একটি অনাদর্শিক উচ্ছিষ্ট শ্রেনীকে একত্রিত করে নিজেকে সর্দার ভাবার নাম রাজনীতি নয়। নিজের চোখ বন্ধকরে নির্লজ্জ দুর্নিতির মাধ্যমে অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার নাম রাজনীতি নয়। মানুষের কন্ঠ রোধ করে ম্যান্ডেট ছিনিয়ে নেওয়ার নাম রাজনীতি নয়। জোর করে নেতৃত্ব দখল করে জননেতার আসনে আসিন হওয়া নেতা রাজনীতিবিদ নয়। নিদৃষ্ট কোন দৃশ্যমান বৈধ আয়ের উৎস জনগনের নিকট উপস্থাপন না করে জনদরদী হিসাবে উপস্থাপনের নাম রাজনীতিবিদ নয়। আমজনতাকে বোকা মনে করার নামও রাজনীতি নয়। রাজনীতিকে ব্যাবসার একটি সহজ মাধ্যম মনে করা রাজনীতিবিদের আদর্শ নয়। ধর্মীয় সাম্প্রদায়ীকতার নাম রাজনীতি নয়। ভয় ও আতঙ্কিত সমাজ বিনির্মানের নাম রাজনীতি নয়।

রাজনীতি এক মহান নীতি, যেই নীতি ধারন করে অনেক খ্যাতিমান মানুষ মহান মানুষ হিসাবে পরিনত হয়েছেন। ইতিহাস তার প্রতিটি পৃষ্ঠায় রাজনীতির সু-সন্তানদেরকে ধারন করে লালন করে। রাজনীতিবিদদের জীবন ইতিহাসই ইতিহাসের প্রতিটি পঙ্কতিতে অঙ্কিত।ঐতিহাসিক প্রয়োজনে কোন কোন রাজনীতিবিদের জন্ম হলেও ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দিয়ে পরবর্তিতে তারা নিজেরাই ইতিহাস হয়েছেন। সভ্যতার বিবর্তনে রাজনীতিই শ্রেষ্ঠ নীতি। রাজনীতিই মানুষকে শোষন মুক্ত সমাজ উপহার দিয়েছেন। রাজনীতিই রাষ্ট্র পরিচালনার রননীত রনকৌশল উপহার দিয়েছেন। সংবিধান, সুশাষন, গনতন্ত্র, মানবাধীকার, স্বাধীনতা,সাম্য,ভাতৃত্ব, উন্নত জীবন রাজনীতি থেকেই সৃষ্ট্রি হয়েছে।

রাজনীতিতে সংঘাত সংঘর্ষ থাকলেও পরিশেষে ঝড়ের তান্ডবের পর নুতন সৃষ্টিই রাজনীতির ধর্ম। রাজনীতিবিদগন রাজনীতিজীবি নয়। রাজনীতিজীবিগন রাজনীতিবিদ হিসাবে গন্য হতে পারে না। সাধারন জনগন এর পার্থক্য ঠিকই বুঝতে পারে দলীয় কর্মীদেরকে এই পার্থক্য প্রথমেই বুঝে তারপরই সেই নেতার পিছনে হাটতে হবে। রাজনীতিজীবিগন অনেক ক্ষমতাশীল জ্ঞানী ও খ্যাতিমান হলেও জনগনের অন্তরে তাদের স্থান নেই। রাজনীতির অনুপস্থিত মালিক(absentee owner) জনগন। সুবিধামত সময়ে জনগন ঠিকই জবাব দিতে জানে। বর্তমান সমকালে রাজনীতিবিদদের হাত থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিনতাই হলেও সকল সময়ের জন্য স্থায়ী নয়। রাজনীতিজীবি বোকাদের দুইটি অপরাধ প্রথমত তাহারা নিজেরাই বোকা, দ্বিতীয়ত অপরাধ জনগনকে তাহারা বোকা মনে করে। কালের অাবর্তে রাজনীতিবিদগনই ঠিকে থাকে। রাজনীতিজীবিগন ইতিহাসের আস্তাকুড়ে হারিয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *